অনুপ্রাণন, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল এ আপনাকে স্বাগতম!
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
জুন ১৪, ২০২৪
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অনুবাদ : মুহসীন মোসাদ্দেক -
হারুকি মুরাকামি’র কার্নাভাল

First Person Singular by Haruki Murakami review – crowd-pleaser in cruise control | Haruki Murakami | The Guardian

এখন পর্যন্ত আমি যত নারীকে চিনি, তার মধ্যে সে ছিল দেখতে সবচেয়ে কুৎসিত। তবে ব্যাপারটা উল্লেখ করার জন্য এটা হয়তো উপযুক্ত পন্থা নয়। আমি অসংখ্য নারীকে চিনি যাদের চেহারা কুৎসিত। যাইহোক, ব্যাপারটা এভাবে বলা আমার জন্য নিরাপদ হবে যে, আমি আমার জীবনে যে সমস্ত নারীর সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম—যারা আমার স্মৃতির জমিনে শিকড় গেড়েছে—তাদের মধ্যে সে-ই ছিল প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে কুৎসিত। আমি অবশ্য কিছুটা ভদ্রস্থ বিকল্প কোনো শব্দ ব্যবহার করতে পারি এবং কুৎসিতের জায়গায় নিম্নতম সুন্দর বলতে পারি, যা পাঠকদের, বিশেষ করে নারী পাঠকদের জন্য গ্রহণ করা সহজ হবে। কিন্তু তার পরিবর্তে, এখানে আমি সবচেয়ে সোজাসাপটা (এবং কিছুটা নিষ্ঠুর) শব্দটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ কারণে যে, সে আসলে কেমন ছিল তার নির্যাস আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরা।

আমি তাকে ‘এফ*’ নামে সম্বোধন করতে যাচ্ছি। বেশ কিছু কারণে তার আসল নাম প্রকাশ করা উচিত হবে না। প্রসঙ্গক্রমে, তার আসল নামের সাথে ‘এফ’বা ‘*’-এর কোনো সম্পর্ক নেই।

‘এফ*’ হয়তো কোথাও না কোথাও গল্পটি পড়বে। সে প্রায়ই আমাকে বলত, সে কেবল জীবিত নারী লেখকদের লেখার প্রতি আগ্রহী, তবে আকস্মিকভাবে এ লেখা তার সামনে পড়ে যাওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। এবং যদি তা হয় নিশ্চিতভাবেই সে নিজেকে এখানে উপলব্ধি করতে পারবে। এমনকি যদি এটি ঘটে থাকে, আমি নিশ্চিত যে আমার এই কথাটি ‘এখন পর্যন্ত আমি যত নারীকে চিনি, তার মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে কুৎসিত’ তাকে খুব বিব্রত করবে। আমি যতদূর জানি, এটা তার কাছে এমনকি হাস্যকরও মনে হতে পারে। অন্য যে কারও চেয়ে সে-ই বেশি অবগত ছিল যে, তার চেহারা মোটেই আকর্ষণীয় নয়, বরং কুৎসিত, ঠিক যেমনটি আমি বলেছি। তবুও তার সুবিধার জন্য এটি ব্যবহার করে আরাম পেয়েছি।

আমার ধারণা এরকম ঘটনা খুব বেশি নেই। প্রথমত, এমন কুৎসিত নারী খুব বেশি নেই যারা উপলব্ধি করে যে তারা কুৎসিত এবং যারা তাদের কদর্যতায় কিছুটা হলেও তৃপ্ত, সংখ্যায় তারা অবশ্যই একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। সেই হিসাবে, আমি মনে করি সে ছিল অনন্য। এবং এটি সেই অনন্যতা যা সবাইকে তার দিকে আকৃষ্ট করেছিল। একটি চুম্বক ঠিক যেমন করে সব ধরনের ধাতুকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে—কিছু কাজের, কিছু অকাজের।

কদর্যতা নিয়ে কথা বলা মানে সৌন্দর্য নিয়েও কথা বলা।

আমি বেশ কজন সুন্দরী নারীকে চিনি, যাদের যে কেউ এক দেখায় আবেদনময় এবং মোহনীয় মনে করবে। কিন্তু আমার কাছে সেইসব সুন্দরী নারীকে, অন্তত তাদের অধিকাংশকেই মনে হয় না যে তারা সত্যিকারে ও নিঃশর্তভাবে সুন্দর হওয়ার আনন্দ পেতে সক্ষম। আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগে। যে নারীরা জন্মগতভাবেই সুন্দর তারা সবসময়ই পুরুষদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে। অন্য নারীরা তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয় এবং তারা প্রচুর প্রশ্রয় পায়। সবাই তাদের দামি উপহার দেয় এবং তাদের বাছাই করা পুরুষ থাকে। তবু তাদের তৃপ্ত মনে হয় না কেন? কখনো কখনো কেন তাদের বিষণœ মনে হয়?

আমি লক্ষ্য করেছি যে, আমার পরিচিত বেশিরভাগ সুন্দরী নারী অসন্তুষ্ট এবং তাদের চেহারার ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ ত্রুটিগুলো নিয়ে বিরক্ত। এই ধরনের যে কোনো কিছু যে কোনো ব্যক্তির শারীরিক গঠনে অবধারিত রূপেই দেখা যায়। তারা এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অবসেশনে ভোগে। তাদের বুড়ো আঙুলগুলো খুব বড়, বা তাদের নখগুলো অদ্ভুতভাবে মাঝামাঝি অবস্থানে নেই, বা তাদের স্তনের বোঁটা একই আকারের নয়। আমার পরিচিত একজন আকর্ষণীয় রূপবতী নারী নিশ্চিত যে, তার কানের লোবগুলো খুব দীর্ঘ এবং সেগুলো লুকানোর জন্য সবসময় সে তার চুল লম্বা করে রাখে। আমি কখনো কারও কানের লোবের দৈর্ঘ্য নিয়ে মাথা ঘামাই নি (সে আমাকে একবার তার কান দেখিয়েছিল এবং আমার কাছে সেগুলো পুরোপুরি স্বাভাবিক লেগেছিল)। যদিও, হতে পারে, কানের লোব সম্পর্কিত এই সমস্ত বিষয় কেবল একটি বিকল্প মাত্র, যেন অন্য কিছু প্রকাশ করার একটি উপায়।

এইসব নারীর তুলনায়, একজন নারী যে কিনা সুন্দর নয়—এমনকি যাকে কুৎসিতও বলা যেতে পারে—এবং এরপরও সেই সত্যটিকে সে উপভোগ করে, সে কি অনেক বেশি সুখি মানুষ নয়? একজন নারী, তা সে যতই সুন্দর হোক না কেন, তারও সবসময়ই কিছু একটা খুঁত থাকে এবং একইভাবে একজন নারী যতই কুৎসিত হোক না কেন, তারও এমন একটি অংশ থাকে যা সবসময়ই সুন্দর। এবং নিজেদের সেই অংশ নিয়েই তাদের স্বচ্ছন্দে আনন্দিত বলে মনে হয়, সুন্দরী নারীরা এক্ষেত্রে তাদের ঠিক বিপরীত। এটা কোনো কিছুর বিকল্প নয়, বা কোনো রূপকও নয়।

এটাকে গতানুগতিক একটা মতামত মনে হতে পারে, তবে আমরা কোনো কিছুকে কীভাবে দেখি তার উপর নির্ভর করে পৃথিবী বদলে যেতে পারে। যেভাবে সূর্যালোকের একটি রশ্মি কোনো কিছুতে পড়ে তা ছায়াকে আলোতে বা আলোকে ছায়ায় রূপান্তরিত করতে পারে। একটি ইতিবাচক কিছু যেমন নেতিবাচক, আবার নেতিবাচক কিছু ইতিবাচক হয়ে যেতে পারে। আমি ঠিক জানি না যে, এটা কি বিশ্বের কার্যকলাপের একটি অপরিহার্য অংশ, নাকি কেবলই চোখের বিভ্রম। ঠিক এভাবেই ‘এফ*’ ছিল আলোর এক ধরনের ভেলকি।

আমার এক বন্ধু তার সাথে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আমার বয়স তখন সবে পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে এবং সে আমার থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট ছিল। কিন্তু তার কাছে বয়স কোনো ব্যাপার ছিল না। তার চেহারা অন্য যে কোনো ব্যক্তিগত কারণকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বয়স, উচ্চতা, স্তনের গঠন ও আকার, পায়ের বুড়ো আঙুলের নখের আকৃতি বা কানের লোবের দৈর্ঘ্য, সবকিছুই তার সৌন্দর্যের অভাবের জন্য পেছনের আসনে চলে গিয়েছিল।

আমি সানটোরি হলের একটি কনসার্টে গিয়েছিলাম। ইন্টারমিশনের সময় আমার এক বন্ধুর পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে দেখা হয়। ওয়াইনের গ্লাস হাতে বন্ধুটার সাথেই ছিল ‘এফ*’। সেই সন্ধ্যার প্রোগ্রামে মহলারের একটি সিম্ফনি ছিল (কোনটি সেটা আমি ভুলে গেছি)। প্রোগ্রামের প্রথমার্ধে প্রোকোফিয়েভের রোমিও এবং জুলিয়েট দেখানো হয়েছিল। আমার বন্ধু আমাকে ‘এফ*’-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এবং আমরা তিনজন একসাথে কিছুটা ওয়াইন পান করেছিলাম, সেইসাথে প্রোকোফিয়েভের সঙ্গীত সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। আমরা তিনজনই একা একাই কনসার্টে গিয়েছিলাম এবং আমার বন্ধুটিও আমার মতো সেখানে গিয়েই তার দেখা পায়। যারা একা একাই কনসার্টে যায় তারা সবসময় সংহতির অনুভূতি ভাগ করে নেয়, যদিও তা সামান্য।

স্বাভাবিকভাবেই, ‘এফ*’-কে দেখার পর আমার প্রথম ধারণা হয়েছিল সে-ই একমাত্র কুৎসিত নারী। যদিও সে এতটাই বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সরল ছিল যে, আমার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় নিজেই বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে কীভাবে ব্যাপারটা ঠিক করা যায়, কিন্তু কথা বলতে বলতে আমি তার চেহারায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তখন আর কোনো ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল না। সে ছিল বিদগ্ধ ব্যক্তি এবং বেশ ভালো একজন বক্তা, সেই সাথে ব্যাপকভাবে গল্প-আলাপে সক্ষম। বিচক্ষণ ও উন্নত সঙ্গীত রুচিকেও এখানে যোগ করুন। যখন ইন্টারমিশনের সমাপ্তি ঘণ্টা বাজল এবং এরপর যখন আমরা বিদায় নিলাম, তখন আমি ভাবছিলাম যে, সে যদি কেবল রূপবতী হতো, কিংবা তার চেহারা যদি অন্তত আরেকটু ভালো হতো তবে সে খুব আবেদনময়ী নারী হতো।

কিন্তু পরবর্তীতে, আমি দৃঢ়ভাবে শিখেছি যে, আমার চিন্তা-ভাবনা কতটা অগভীর ও কৃত্রিম ছিল। এটা অবশ্যই এ কারণে যে, সে তার অস্বাভাবিক চেহারার সাথে তার শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের বন্ধন স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল—মানুষকে কাছে টানতে পারার ক্ষমতা, এটাও আপনাকে আমলে নিতে হবে। আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, তার চেহারার বাহ্যিক রূপ এবং একাগ্রতার মাঝে এটা এমন এক বৈসাদৃশ্য যা তার নিজস্ব ডাইনামিজমের বিশেষ ব্র্যান্ড স্থাপন করেছিল। সে তার সেই শক্তি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিল এবং প্রয়োজন অনুসারে তা ব্যবহার করতেও সক্ষম ছিল।

তার চেহারার ঠিক কোন দিকটা এতটা আকষর্ণহীন ছিল তা বর্ণনা করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আমি তাকে যেভাবেই বর্ণনা করার চেষ্টা করি না কেন, আমি কখনোই পাঠকদের কাছে তার চেহারার বৈশিষ্ট্যগুলো সঠিকভাবে বোঝাতে সক্ষম হবো না। তবে একটা বিষয় আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, তা হলো: আপনি কার্যত কোনো খুঁত চিহ্নিত করতে পারবেন না। সুতরাং ব্যাপারটা এমন ছিল না যে, এই অংশটি বিদঘুটে, বা এই অংশটি ঠিক করুন এবং তাতে তাকে কিছুটা সুন্দর দেখাবে। তবুও সবগুলোকে একত্রিত করুন এবং আপনি আঙ্গিকভাবে ব্যাপক কদর্যতায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবেন। (তুলনাটা উদ্ভট, কিন্তু প্রক্রিয়াটি আমাকে শুক্রগ্রহের জন্মের কথা মনে করিয়ে দেয়।) এবং শব্দ বা যুক্তির পক্ষে তা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এমনকি ধরে নিন আমি পারব, আর যাইহোক তা কোনোভাবেই পর্যাপ্ত হবে না। এখানে আমরা যা করতে পারি তা হলো, দুটি বিকল্পের ভেতর থেকে একটি বাছাই করা, এবং মাত্র দুটিই—আমরা হয় এটিকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি, নিঃশর্তভাবে, এটা যে রূপে আছে ঠিক সেভাবেই, অথবা আমরা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করি। আপসহীন আক্রমণাত্মক ধরনের যুদ্ধের মতো।

আন্না কারেনিনার সূচনাতে তলস্তয় লিখেছেন, ‘সুখী পরিবার সকলেই একরকম; প্রতিটি অসুখী পরিবার তার নিজস্ব ধরনের অসুখী’, এবং আমি মনে করি সৌন্দর্য বা কদর্যতা প্রকাশে নারীদের মুখের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমি বিশ্বাস করি (এবং অনুগ্রহ করে এটাকে শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেই গ্রহণ করুন) যে, সুন্দরী নারীদের কেবল ‘সুন্দর’ বলে অভিহিত করা যেতে পারে। তাদের প্রত্যেকে একটি সুন্দর, সোনালি পশমের বানরকে তাদের পিঠে নিয়ে ঘোরে। তাদের পশমের ঔজ্জ্বল্য এবং গঠনে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, তবে তারা যে প্রভা ছড়ায় তাতে তাদের সবাইকে এক এবং অভিন্ন বলে মনে হয়।

বিপরীতে, কুৎসিত নারীরা প্রত্যেকে একটি উষ্কখুষ্ক বানরের নিজস্ব স্বতন্ত্র সংস্করণ বহন করে। তাদের বানরের মধ্যে সামান্য, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—তাদের পশম কতটা গৃহীত হয়, কোথায় কোথায় তাদের পশমের ঘনত্ব কমে গেছে, তারা কতটা নোংরা ইত্যাদি। তাদের কোনো দীপ্তি নেই, তাই সোনালি পশমের বানরগুলোর বিপরীতে, আমাদের চোখ তাদের প্রতি মুগ্ধ হয় না।

‘এফ*’ যে বানরটিকে তার পিঠে নিয়ে ঘুরছিল তার বিভিন্ন অভিব্যক্তি ছিল এবং এর পশমে—যদিও তা কখনোই ঝকঝকে বা চকচকে ছিল না—একসাথে বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণ ছিল। আপনি যে কোণ থেকে তাকে দেখেছেন, সেইসাথে আবহাওয়া, বাতাস, দিক, দিনের সময়ের উপর নির্ভর করে সেই বানরের প্রতি যে কারও অনুভূতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। অন্যভাবে বলতে গেলে, তার বৈশিষ্ট্যগুলোর কদর্যতা ছিল একটি অনন্য শক্তির ফলাফল যা সমস্ত গঠন এবং আকারের অনাকর্ষণীয় উপাদানগুলোকে সংকুচিত করে তাদের এক জায়গায় একত্রিত করেছিল। এবং তার বানরটি খুব আয়েশে ও নিঃসংকোচে তার পিঠে নিঃশব্দে বসতি স্থাপন করেছিল, যেন প্রতিটি সম্ভাব্য কারণ ও প্রভাব বিশ্বের একেবারে কেন্দ্রে জড়ো হয়েছিল।

দ্বিতীয়বার আমি যখন ‘এফ*’-এর সাথে দেখা করি, কিছুটা হলেও এই সমস্ত কিছু সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম, তারপরও নির্দিষ্টভাবে এটা খোলাসা করতে অক্ষম। আমি জানতাম যে তার কদর্যতা বুঝতে কিছুটা সময় লাগবেই, এবং তার জন্য অন্তর্দৃষ্টি, দর্শন, নৈতিকতা ও কিছুটা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এবং তার সাথে সময় কাটানো, একটি নির্দিষ্ট সময়ে, এক ধরনের ভালো লাগার অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়। এটা আসলে ভালো লাগার ব্যাপার ছিল যে, আমরা যে কোনোভাবে অপরিহার্য অন্তর্দৃষ্টি, দর্শন, নৈতিকতা এবং জীবনের অভিজ্ঞতাকে বাগে আনতে পেরেছিলাম।

দ্বিতীয়বারও আমি তাকে একটি কনসার্ট হলে দেখেছিলাম, সানটোরি হলের চেয়ে ছোট একটা ভেন্যু। সেটা ছিল একজন ফরাসি নারী বেহালাবাদকের কনসার্ট। যতদূর আমার মনে পড়ে, তিনি ফ্রাঙ্ক ও ডেবুসির সোনাটা সঙ্গীত বাজিয়েছিলেন। তিনি চমৎকার একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন এবং এই সঙ্গীতগুলো তার সংগ্রহের মধ্যে প্রিয় ছিল, কিন্তু নির্দিষ্ট ওই দিনে তিনি তার সেরা প্রদর্শনী উপস্থাপন করতে পারেন নি। যদিও ক্রিসলারের দুটি সঙ্গীত তিনি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন যা মুগ্ধকর ছিল।

আমি কনসার্ট হলের বাইরে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন সে আমাকে পেছন থেকে ডেকেছিল। ‘এফ*’ তখন তার এক মেয়ে বন্ধুর সাথে ছিল; খাটো, হালকা-পাতলা ও সুন্দরী বন্ধু। ‘এফ*’ বরং বেশ লম্বা ছিল, তবে আমার চেয়ে একটু খাটো।

‘এই রাস্তা থেকে একটু সামনেই আমি একটা জায়গা চিনি’, সে বলল। ‘এক গ্লাস ওয়াইন বা অন্য কিছু পান করতে তুমি কি যেতে চাও?’

ভালো হয়, আমি তাকে বললাম। রাত তখনও তেমন হয় নি এবং কনসার্ট নিয়ে আমি কিছুটা হতাশা অনুভব করছিলাম। এক বা দুই গ্লাস ওয়াইনের সাথে চমৎকার কিছু সঙ্গীত নিয়ে আলাপ করার মতো ইচ্ছে অনুভব করছিলাম আমি।

আমরা তিনজন রাস্তার পাশে খাবারের একটি ছোট দোকানে বসে ওয়াইন ও কিছু স্ন্যাক্স অর্ডার করেছিলাম, কিন্তু তার সুন্দরী বন্ধু একটু পরেই একটি ফোন কল ধরতে উঠে গিয়েছিল। পরিবারের একজন সদস্য তাকে ফোন করেছিলেন জানাতে যে, তার বিড়ালটা অসুস্থ। আর তাই শুধু ‘এফ*’ আর আমিই ছিলাম তখন। কিন্তু আমি আসলে হতাশ হই নি, যেহেতু এই সময়ের মধ্যে ‘এফ*’-এর প্রতি আগ্রহী হতে শুরু করেছি। তার পোশাক-আশাকের রুচি চমৎকার ছিল এবং স্পষ্টতই বেশ দামি ও উন্নতমানের নীল রঙের সিল্কের পোশাক পরেছিল। যে অলঙ্কার সে পরেছিল তা-ও ছিল একদম মানানসই। সাধারণ, তবে নজর কেড়ে নেয়ার মতো। এবং তখনই আমি লক্ষ্য করলাম যে, সে বিয়ের আংটি পরে আছে।

আমরা কনসার্ট নিয়ে কথা বললাম। আমরা সম্মত হয়েছিলাম যে, বেহালাবাদক তার সেরাটা উপস্থাপন করতে পারেন নি। হয়তো তিনি সুস্থ বোধ করছিলেন না, অথবা তার আঙুলে ব্যথা ছিল, কিংবা সে হোটেলের রুম নিয়ে খুশি ছিলেন না। অন্তত কোনো সন্দেহ নেই যে কিছু একটা সমস্যা ছিল। আপনি যখন ঘন ঘন কনসার্টে অংশগ্রহণ করবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন।

আমরা যে ধরনের সঙ্গীত পছন্দ করি আমাদের আলাপ সেদিকে মোড় নিল। আমরা সম্মত হয়েছিলাম যে দুজনেই পিয়ানো সঙ্গীত সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। অবশ্যই আমরা অপেরা, সিম্ফনি এবং চেম্বার মিউজিক শুনতাম, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে ভালো লাগতো সলো পিয়ানো মিউজিক। এবং আশ্চর্যজনকভাবে, আমাদের প্রিয় সঙ্গীতগুলোর অধিকাংশই মিলে গিয়েছিল। আমরা কেউই চোপিন নিয়ে খুব বেশি দিন উৎসাহী হতে পারি নি। অন্তত আমরা যা শুনতে চাইতাম তা তেমন ছিল না। মোজার্টের পিয়ানো সঙ্গীত ছিল সুন্দর এবং নিশ্চিতভাবেই মুগ্ধকর, কিন্তু সত্যি বলতে আমরা এতে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। বাখের দ্য ওয়েল-টেম্পারড ক্ল্যাভিয়ার চমৎকার ছিল, কিন্তু সত্যিই ফোকাস করার জন্য একটু বেশিই দীর্ঘ ছিল। এটা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য আপনার ভালো শারীরিক গঠন থাকতে হবে। বিথোভেনের পিয়ানো সঙ্গীত কখনো কখনো অত্যধিক গাম্ভীর্যের কারণে আমাদের কাঁপিয়ে দেয় এবং (আমরা বিশ্বাস করি) এটা ইতিমধ্যেই বোধগম্যতার প্রতিটি দিক থেকে যথেষ্ট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ব্রাহমসের পিয়ানো সঙ্গীত যেকোনো অনুষ্ঠানে শোনার জন্য মনোরম ছিল, কিন্তু সারাক্ষণ শোনার ক্ষেত্রে ক্লান্তিকর। এবং ডুবেসি এবং রাভেলের সঙ্গীত শোনার জন্য আপনাকে সাবধানে সময় এবং স্থান বেছে নিতে হবে, অন্যথায় আপনি তাদের সঙ্গীতের সম্পূর্ণ মর্ম উপলব্ধি করতে পারবেন না।

নিঃসন্দেহে, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পিয়ানো সঙ্গীত সম্ভারের শীর্ষ স্থানে ছিল শুবার্টের বেশ কয়েকটি সোনাটা এবং শুম্যানের সঙ্গীত। তাদের মধ্যে, তুমি কোনটি বেছে নিবে?

মাত্র একটা?

ঠিক, ‘এফ*’ বলল, মাত্র একটা। একটিমাত্র পিয়ানো সঙ্গীত যা তুমি তোমার সাথে মরুদ্বীপে নিয়ে যেতে চাও।

ব্যাপারটা সহজ নয়। আমাকে বেশ গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে।

শুম্যানের কার্নাভাল, আমি অবশেষে ঘোষণা করলাম।

‘এফ*’ তার চোখ সরু করে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর সে টেবিলের উপর তার হাত রেখে সেগুলোকে একত্রিত করে জোরে জোরে আঙুলের গিঁটগুলো ফোটাল। ঠিক দশবার। এত জোরে যে কাছাকাছি টেবিলের লোকেরা আমাদের দিকে ঘুরে তাকাল। শব্দটা বেশ কড়া ছিল, যেন আপনার হাঁটুতে তিন দিনের পুরনো ব্যাগুয়েট ছিঁড়ে ফেলার শব্দ। এরকম লোক খুব বেশি নেই—পুরুষ বা নারী—যারা জোরে জোরে তাদের আঙুলের গিঁট ফোটাতে পারে। আমি এটা পরে বের করেছিলাম, যখন সে উত্তেজিত এবং উৎসাহী থাকত তখন জোরে জোরে আঙুলের গিঁট দশবার ফোটানো তার অভ্যাস ছিল। তবে আমি তখন তা জানতাম না এবং ভাবছিলাম যে, কোনো কিছু তাকে বিরক্ত করেছে কিনা। সম্ভবত কার্নাভাল আমার পছন্দের তালিকায় থাকাটা বেমানান ছিল। কিন্তু সেটা সত্যিই আমার পছন্দ ছিল। আসলে আমি সবসময়ই এই সঙ্গীতটা পছন্দ করতাম। এমনকি যদি তা কাউকে এত রাগান্বিত করে যে, তারা আমাকে ঘুষি মারতে চায়, তবুও আমি এ সম্পর্কে মিথ্যা বলতে আগ্রহী ছিলাম না।

‘তুমি কি সত্যিই কার্নাভাল সাথে করে নিয়ে যেতে চাও?’ সে ভ্রু কুঁচকালো, একটা লম্বা আঙুল তাক করে ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে চাইল। ‘সমগ্র পিয়ানো সঙ্গীতের সম্ভার থেকে একটা টুকরো হিসেবে কোনো মরুদ্বীপে তুমি তোমার সাথে এটাই নিয়ে যেতে চাও?’

আমি অনিশ্চিত বোধ করছিলাম, এখন সে এই কথা বলছে। শুম্যানের অসংলগ্ন পিয়ানো সঙ্গীত, ক্যালাইডস্কোপ মতো সুন্দর এবং কোনোভাবে মানুষের বুদ্ধির সীমার বাইরে সংরক্ষণ করার জন্য, আমি কি সত্যিই বাখের গোল্ডবার্গ ভ্যারিয়েশনস বা ওয়েল-টেম্পারড ক্ল্যাভিয়ারকে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক ছিলাম? নাকি বিথোভেনের পরের দিকের পিয়ানো সোনাটা এবং তার সাহসী ও মুগ্ধকর তৃতীয় কনসার্টো?

ক্ষণস্থায়ী, ভারী নীরবতা নেমে আসে যখন ‘এফ*’ তার মুষ্টি দুটোকে কয়েকবার জোরে জোরে একে অপরের সাথে ধাক্কা দেয় যেন সে পরীক্ষা করে দেখে যে তার হাত ঠিক আছে কিনা।

‘তোমার রুচি চমৎকার’, অবশেষে সে বলল। ‘এবং আমি তোমার সাহসের প্রশংসা করি। আমি তোমার দলেই আছি। শুম্যানের কার্নাভাল আমারও পছন্দ।’

‘সত্যিই?’

‘হুম, সত্যি। আমি সবসময় এটা পছন্দ করি। যতবারই শুনি না কেন কখনোই ক্লান্ত হই না।’

আমরা কিছু সময় এই সঙ্গীতটা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিলাম। এক বোতল পিনোট নয়ার অর্ডার দিয়েছিলাম আমরা এবং কথা বলতে বলতেই তা শেষ করে ফেলেছিলাম। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা অনেকটা বন্ধুর মতো হয়ে গিয়েছিলাম। কার্নাভাল বন্ধু। যদিও এই সম্পর্ক মাত্র ছয় মাস টিকেছিল।

তাই আমরা আমাদের নিজস্ব দুই সদস্যের, প্রাইভেট কার্নাভাল ক্লাব তৈরি করি। মাত্র দুই সদস্যে সীমাবদ্ধ থাকার পেছনে তেমন কোনো কারণ ছিল না, তবে এ ক্লাব কখনোই সেই সংখ্যা অতিক্রম করে নি। কেননা, আমরা এই সঙ্গীত সম্পর্কে আমাদের মতো এরকম পাগল অন্য কাউকে পাই নি।

আমরা কার্নাভালের পারফরম্যান্সের অসংখ্য রেকর্ড ও সিডি শুনেছি এবং যদি কোনো পিয়ানোবাদক তার কনসার্টে সঙ্গীতটি অন্তর্ভুক্ত করে তবে সেই কনসার্টে একসাথে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। আমার নোটবুক অনুসারে (প্রতিটি পারফরম্যান্সের প্রচুর নোট নিয়ে রেখেছিলাম আমি), আমরা তিনজন পৃথক পিয়ানোবাদকের কার্নাভালের লাইভ পারফরম্যান্সে গিয়েছিলাম এবং একসাথে সঙ্গীতটির বিয়াল্লিশটি সিডি এবং রেকর্ড শুনেছিলাম। পরে আমরা তাদের সম্পর্কে স্বাচ্ছন্দ্যে মতামত বিনিময় করতাম। দেখা গেছে যে অনেক পিয়ানোবাদক সঙ্গীতটি রেকর্ড করেছেন, যা তাদের সঙ্গীত সম্ভারের জনপ্রিয় একটি অংশ বলে মনে হয়েছিল। এই সমস্ত কিছুর জন্য, আমরা কেবল হাতেগোনা কয়েকটি পারফরম্যান্স গ্রহণযোগ্য পেয়েছি।

একটি পারফরম্যান্স প্রযুক্তিগতভাবে ত্রুটিহীন হতে পারে, কিন্তু যদি কৌশলটি সঙ্গীতের সাথে সম্পূর্ণরূপে সুসংগত না হয়, কার্নাভাল আঙুলের একটি যান্ত্রিক অনুশীলন ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এতে এর আবেদন অদৃশ্য হয়ে যায়। পিয়ানোবাদকের গড়পড়তা দক্ষতা দিয়ে অভিব্যক্তিটি সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা সত্যিই খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমি কারও নাম বলব না, তবে কিছু বড় পিয়ানোবাদক কোনো প্রকার ক্যারিশমা ছাড়াই তালগোল পাকানো পারফরম্যান্স রেকর্ড করেছেন। এবং অন্য অনেক পিয়ানোবাদক সঙ্গীতটিকে বাজানো সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গিয়েছেন। (অন্তত একমাত্র এমনটাই আমি অনুমান করতে পারি।) ভ. ভ্লাদিমির হরোভিজ শুম্যানের সঙ্গীত পছন্দ করতেন এবং তার ক্যারিয়ার জুড়ে তা পরিবেশন করেছিলেন, কিন্তু কিছু কারণে কার্নাভালের যথাযথ রেকর্ডিং করা হয়ে ওঠে নি। এবং একই কথা সোভিয়াতোস্লাভ রিখটার সম্পর্কেও বলা যেতে পারে। এবং আমি একমাত্র ব্যক্তি হয়তো নই যে একদিন এই সঙ্গীতটি মার্থা আর্জেরিচের পরিবেশনায় শুনতে পছন্দ করবে।

ঘটনাক্রমে, শুম্যানের সমসাময়িক প্রায় কেউ-ই বুঝতে পারেন নি যে, তার সঙ্গীত কতটা চমৎকার ছিল। উদাহরণস্বরূপ, মেন্ডেলসোহন এবং চোপিন শুম্যানের পিয়ানো সঙ্গীত সম্পর্কে খুব বেশি ভাবেন নি। এমনকি শুম্যানের বিধবা স্ত্রী, ক্লারা (তার সময়ের শীর্ষ পিয়ানোবাদকদের একজন), যিনি নিষ্ঠার সাথে তার সঙ্গীত বাজাতেন, গোপনে গোপনে কামনা করতেন যেন তিনি এই ধরনের খামখেয়ালি সঙ্গীত রচনার পরিবর্তে আরও চলতি-মানের অপেরা বা সিম্ফোনিতে মনোনিবেশ করেন। মূলত, শুম্যান সোনাটার মতো ধ্রুপদী ধরন পছন্দ করতেন না, এবং মাঝে মাঝে তার সঙ্গীতগুলো এলোমেলো অবস্থায় আসত। তিনি বিদ্যমান শাস্ত্রীয় ধরনগুলো থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, যার ফলে একটি নতুন ধরনের সঙ্গীত, রোমান্টিক স্কুলের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু তার সমসাময়িকদের বেশিরভাগই মনে করেছিলেন যে তার কাজগুলো উদ্ভট, দৃঢ় কোনো ভিত্তি এবং বিষয়বস্তুহীন। তবে এই সাহসী খামখেয়ালিপনাই রোমান্টিক সঙ্গীতের উত্থানকে তাড়িত করেছিল।

যা কিছুই ঘটুক না কেন, এই ছয় মাসে আমরা দুজনে যতবার সুযোগ পেয়েছি কার্নাভালের রেকর্ডিং শুনেছি। অবশ্য আমরা যে সবার রেকর্ডিং শুনতাম তা নয়—মোজার্ট এবং ব্রাহম বেশিরভাগ সময় আমাদের তালিকায় থাকত—কিন্তু যখনই দেখা করতাম, আমরা কার্নাভালের কোনো একটি সংস্করণ শুনতাম এবং পারফরম্যান্স নিয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়াগুলো শেয়ার করতাম। আমি আমাদের ছোট ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলাম এবং আমাদের মতামতের সারসংক্ষেপ নোট করে রাখতাম। সে বেশ কয়েকবার আমার বাড়িতে এসেছিল, কিন্তু আমি তার ওখানে তেমন যেতাম না, কারণ সে শহরের প্রাণকেন্দ্রের কাছাকাছি থাকত, আর আমি শহরতলিতে ছিলাম। সঙ্গীতটির বিয়াল্লিশটি সংস্করণ শোনার পর, তার এক নম্বর পছন্দ ছিল আর্তুরো বেনেদেত্তি মাইকেলেঞ্জেলির অ্যাঞ্জেল রেকর্ডিং এবং আমার ছিল আর্থার রুবিনস্টাইনের আরসিএ রেকর্ডিং। আমাদের শোনা প্রতিটি ডিস্ককে আমরা যতœ সহকারে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলাম, অবশ্যই এটা মাথায় রেখেই যে এসব খুব বেশি অর্থ বহন করে না। এটা কেবল বাড়তি একটা মজা ছিল। আমাদের কাছে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হলো আমরা যে সংগীতটি পছন্দ করতাম সে সম্পর্কে আলাপ করা এবং প্রায় উদ্দেশ্যহীনভাবে এমন কিছু শেয়ার করার অনুভূতি যে বিষয়ে আমরা উৎসাহী ছিলাম।

আপনি মনে করতে পারেন যে, একজন পুরুষ তার চেয়ে দশ বছরের কম বয়সী একজন নারীর সাথে ঘন ঘন দেখা করলে তার সংসারে কিছু বিবাদ সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু আমার স্ত্রী তাকে নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন ছিল না। আমি অস্বীকার করব না যে, ‘এফ*’-এর অনাকর্ষণীয় চেহারা আমার স্ত্রীর অনাগ্রহে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তার মনে একটুও সন্দেহ বা সংশয় ছিল না যে, ‘এফ*’ এবং আমি যৌন সম্পর্কে জড়াতে পারি, তার চেহারা আমাদের বাড়তি একটা সুবিধা প্রদান করেছে। আমার স্ত্রী আমাদের ‘একজোড়া নির্বোধ’ বলে মনে করত। সে নিজে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আগ্রহী ছিল না, কারণ বেশিরভাগ কনসার্ট তাকে বিরক্ত করেছিল। আমার স্ত্রী ‘এফ*’-কে ‘তোমার গার্লফ্রেন্ড’ বলে ডাকত। এবং কখনো কখনো বিদ্রূপের ইঙ্গিত দিয়ে বলত, ‘তোমার সুন্দরী গার্লফ্রেন্ড’।

আমার সাথে এফ*’-এর স্বামীর কখনোই সাক্ষাৎ হয় নি। (তার কোনো সন্তান ছিল না)। ব্যাপারটা হয়তো কাকতালীয়, আমি যখনই তার বাসায় যেতাম তখনই তিনি বাইরে থাকতেন, কিংবা সে নির্দিষ্টভাবে ওই সময়টাই বেছে নিত যে সময় তার স্বামী বাসায় থাকত না। অথবা সম্ভবত তার স্বামী বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকতেন। কোনটা আসলে ঠিক, আমি বলতে পারি না। বলতে গেলে, আমি নিশ্চিতভাবে বলতেও পারি না যে সত্যিই তার স্বামী ছিল কিনা। সে কখনোই তার স্বামী সম্পর্কে একটি কথাও বলে নি এবং যতদূর মনে পড়ে, সেই বাসার কোথাও পুরুষ মানুষ থাকার কোনো চিহ্ন ছিল না। তা সত্ত্বেও, সে ঘোষণা করেছিল যে তার স্বামী আছে এবং বিয়ের চিহ্ন হিসেবে সে তার বাম হাতের অনামিকাতে একটি ঝকঝকে সোনার আংটি পরেছিল।

সে তার অতীত সম্পর্কে কখনো একটি কথাও বলে নি। সে কখনোই বলে নি যে সে কোথা থেকে এসেছে, তার পরিবার কেমন ছিল, সে কোন স্কুলে পড়ত, বা তার চাকরিটা কী ধরনের। আমি যদি তাকে ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম, তবে উত্তরে যা পেতাম তা হলো অস্ফুট শ্লেষ বা নিঃশব্দ হাসি। আমি তার সম্পর্কে শুধু জানতাম যে সে কিছু ‘স্পেশালাইজড ফিল্ড’-এ কাজ করত এবং তার জীবনযাত্রা বেশ বিলাসবহুল ছিল। সে টোকিওর আধুনিক এলাকা ডাইকানিয়ামায় সবুজে ঘেরা একটি বিল্ডিংয়ের তিন বেডরুমের মার্জিত একটি ফ্ল্যাটে থাকত, একেবারে নতুন একটি বিএমডব্লিউ সেদান চালাত এবং তার বসার ঘরে একটি দামি স্টেরিও সিস্টেম ছিল। এটি একটি উন্নতমানের অ্যাকুফেজ প্রি-মেইন অ্যাম্প এবং সিডি প্লেয়ার যার সাথে বড় ও নজরকাড়া লিন স্পিকার ছিল। এবং সে সবসময় আকর্ষণীয়, ঝকঝকে পোশাক পরত। আমি নারীদের পোশাক সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না, তারপরও আমি বলতে পারি যে সেগুলো ছিল বেশ দামি ও ডিজাইনার আইটেম।

যখন গানের কথা আসত, তখন সে ছিল বাকপটু। তার কান ছিল প্রখর এবং সে যা শুনত তা বর্ণনা করার যথাযথ উপায় নির্বাচন করে ফেলত। সঙ্গীত সম্পর্কে তার জ্ঞানও ছিল গভীর এবং বিস্তৃত। কিন্তু যখন সঙ্গীত ছাড়া অন্য কিছুর কথা আসত, তখন সে ছিল বেশ রহস্যময়। আমি তার ভেতর থেকে কথা বের করে আনতে আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে কখনোই নিজেকে মেলে ধরে নি।

একবার সে আমাকে শুম্যান সম্পর্কে বলেছিল।

সে বলেছিল, ‘শুবার্টের মতো শুম্যান অল্প বয়সে যৌনরোগের সাথে লড়াই করেছিলেন এবং এই রোগটি ধীরে ধীরে তার মনকে প্রভাবিত করেছিল। এছাড়াও, তার সিজোফ্রেনিক প্রবণতা ছিল। তিনি নিয়মিত ভয়ানক অডিটরি হ্যালুসিনেশনে ভুগছিলেন এবং তার শরীর অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি দ্বারা কবলিত হয়েছিল। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তাকে অশুভ আত্মারা তাড়া করছে এবং তাদের আক্ষরিক অস্তিত্বে বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন। অন্তহীন, আতঙ্কময় দুঃস্বপ্নের কবলে পড়ে বহুবার তিনি নিজেকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি একবার তিনি রাইন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ বিভ্রম ও বাহ্যিক বাস্তবতা তার ভেতরে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কার্নাভাল তার প্রথম দিকের কাজ ছিল, তাই তার অশুভ আত্মারা এখানে তাদের অস্তিত্ব পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করছিল না। যেহেতু সঙ্গীতটি কার্নিভাল উৎসব সম্পর্কিত, যে উৎসবে মুখ জুড়ে প্রফুল্ল চেহারার মুখোশ আবৃত থাকে, তবে এটি নিছক কিছু সুখি কার্নিভাল ছিল না। শেষ পর্যন্ত তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অশুভ আত্মাগুলো সঙ্গীতটিতে উপস্থিত হয় সুখি কার্নিভালের মুখোশ পরে, একের পর এক, যেন এক মুহূর্তের জন্য পরিচয়। তাদের চারপাশে, বসন্তের প্রথম দিকের অশুভ বাতাস বইছে। মাংস ও ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দিয়ে সবাইকে পরিবেশন করা হয়। কার্নিভাল হলো আক্ষরিক অর্থে মাংসের জন্য কৃতজ্ঞতার উৎসব এবং এর বিদায়ের পর বসন্তকাল শুরু হয়। এটা ঠিক এই ধরনের সঙ্গীত।’

‘সুতরাং পাফরমারকে সঙ্গীতের মাধ্যমে, মুখোশ এবং মুখোশের নিচে উপস্থিত থাকা সমস্ত চরিত্রকে প্রকাশ করতে হবে। তুমি কি এটাই বলছ?’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।

সে মাথা নেড়েছিল। ‘ঠিক। একদম ঠিক। তুমি যদি ওই অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারো, তবে তা পরিবেশন করে কী লাভ? সঙ্গীতটি নাটকীয় সঙ্গীতের আদর্শ, তবে সেই নাটকীয়তার মধ্যে তুমি আত্মার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অপচ্ছায়াগুলো এক ঝলক দেখে নিতে পারবে। নাটকীয়তার ধ্বনি তাদের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে প্রলুব্ধ করে।’

সে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল, তারপর বলতে থাকে।

‘আমরা সবাই কমবেশি মুখোশ পরে থাকি। কারণ মুখোশ ছাড়া আমরা এই হিংস্র পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারব না। অশুভ আত্মার মুখোশের নিচে একটি দেবদূতের সহজাত মুখ, দেবদূতের মুখোশের নিচে একটি অশুভ আত্মার মুখ থাকে। কেবল একটি বা অন্যটি থাকা অসম্ভব। এই হলাম আমরা। এবং এটাই কার্নাভাল। শুম্যান মানবতার অনেক মুখ দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন—মুখোশ এবং আসল মুখগুলো—কারণ তিনি নিজেই একজন গভীরভাবে বিভক্ত আত্মা ছিলেন, এমন একজন ব্যক্তি যিনি দুজনের মধ্যে নিঃশ্বাস দূরত্বে বাস করতেন।’

সম্ভবত সে যা বলতে চেয়েছিল তা হলো একটি কুৎসিত মুখোশ এবং তার নিচে সুন্দর একটি মুখ—একটি সুন্দর মুখোশ এবং তার নিচে কুৎসিত একটি মুখ। এই ভাবনাটা তখন আমাকে তাড়িত করেছিল। হয়তো সে সত্যিই নিজের কিছু দিক সম্পর্কে কথা বলছিল।

‘কিছু লোকের ক্ষেত্রে, মুখোশটি এত শক্তভাবে আটকে যেতে পারে যে তারা সেটা আর সরাতে পারে না’, আমি বলেছিলাম।

‘হ্যাঁ।’ সে শান্তস্বরে বলেছিল। ‘হয়তো এটা সত্যি।’ সে মৃদু হাসি দিয়েছিল। ‘তবে একটি মুখোশ আটকে গেলে এবং তা আর সরানো না গেলেও, এর নিচের সত্যটিকে পরিবর্তন করতে পারে না, মুখোশের নিচে আসল চেহারাটা রয়ে যায়।’

‘যদিও কেউ তা আর দেখতে পাবে না।’

সে মাথা নেড়েছিল। ‘এমন লোকও থাকতে পারে। নিশ্চয়ই থাকবে, কোথাও না কোথাও।’

‘কিন্তু রবার্ট শুম্যান তাদের দেখতে পেয়েছিলেন। এবং তা তাকে অসুখী করেছিল। সিফিলিস, সিজোফ্রেনিয়া এবং অশুভ আত্মার কারণে।’

‘যদিও, তিনি এই দুর্দান্ত সঙ্গীতটি রেখে গেছেন।’ সে বলেছিল। ‘এক ধরনের বিস্ময়কর সঙ্গীত যা অন্য কেউ লিখতে পারেন নি।’ সে পালাক্রমে জোরে জোরে তার উভয় হাতের প্রতিটি আঙুলের গিঁট ফোটালো। ‘সিফিলিস, সিজোফ্রেনিয়া এবং অশুভ আত্মার কারণে। সুখ সবসময় একটি আপেক্ষিক বিষয়। তোমার কি তা মনে হয় না?’

‘হতে পারে।’ আমি বলেছিলাম।

‘ভ্লাদিমির হরোভিজ একবার রেডিওর জন্য শুম্যানের এফ মাইনর সোনাটা রেকর্ড করেছিলেন।’ সে বলেছিল। ‘তুমি কি এই গল্প শুনেছো?’

‘না, আমার মনে হয় না।’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম। শুম্যানের ৩ নম্বর পিয়ানো সোনাটা শোনা (এবং কল্পনা করা) শ্রমসাধ্য ব্যাপার।

‘যখন তিনি রেডিওতে এই রেকর্ডিংটি শুনেছিলেন, তখন হরোভিজ সেখানে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিলেন এবং একেবারে বিষণœতায় ডুবে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এটা ভয়ঙ্কর।’

সে তার অর্ধ-পূর্ণ গ্লাসে লাল ওয়াইনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

‘এবং তিনি যা বলেছিলেন তা হলো: “শুম্যান পাগল ছিল, কিন্তু আমি তাকে নষ্ট করে দিয়েছি।” তুমি কি এটা পছন্দ করো না?’

‘আমি তা করি।’ আমি সম্মতি জানিয়েছিলাম।

আমি তাকে, কোনো একভাবে, একজন আকর্ষণীয় নারী হিসেবে আবিষ্কার করি। যদিও আমি তাকে নিয়ে যৌন সম্পর্কের কথা সত্যিই চিন্তা করি নি। সেই অর্থে, আমার স্ত্রীর বিবেচনা সঠিক ছিল। কিন্তু এটা তার অনাকর্ষণীয় চেহারার কারণে ছিল না যা আমাকে তার সাথে যৌন সম্পর্ক করতে বাধা দেয়। আমি মনে করি না যে তার কদর্যতা স্বয়ং আমাদের একসাথে মিলিত হতে বাধা দিবে। যা আমাকে তার সাথে প্রণয় করতে বাধা দিয়েছিল তা তার মুখোশের সৌন্দর্য বা কদর্যতা ছিল না, কিন্তু আমি মুখোশের নিচে কী দেখতে পাব সেটাই ছিল আমার বড় ভয়। সেটা অশুভর মুখই হোক বা দেবদূতের।

অক্টোবরে ‘এফ*’ আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি কার্নাভালের দুইটি নতুন, বরং আকর্ষণীয় সিডি পেয়েছিলাম এবং তাকে কয়েকবার ফোন করেছিলাম, ভেবেছিলাম আমরা সেগুলো একসাথে শুনতে পারি, কিন্তু তার সেল ফোন সবসময় ভয়েস মেইলে চলে যাচ্ছিল। আমি তাকে কয়েকবার ইমেইলও করেছিলাম, কিন্তু কোনো উত্তর পাই নি। শরতের কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল, অক্টোবরও শেষ হয়ে গেল। নভেম্বর এলো এবং লোকেরা কোট পরতে শুরু করে দিল। তখন সেটাই ছিল আমাদের যোগাযোগবিহীন দীর্ঘতম সময়। আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো দীর্ঘকালীন ভ্রমণে গিয়েছিল, অথবা হয়তো সুস্থতা বোধ করছিল না।

আমার স্ত্রীই প্রথম তাকে টিভিতে দেখেছিল। আমি আমার ঘরে ডেস্কে বসে কাজ করছিলাম। ‘আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু আমার মনে হয় তোমার বান্ধবীকে টিভির খবরে দেখাচ্ছে,’ আমার স্ত্রী বলেছিল। ভেবে দেখুন, সে একবারও ‘এফ*’-এর নাম ব্যবহার করে নি। সবসময়ই সে ‘তোমার বান্ধবী’ বলত। কিন্তু আমি টিভির কাছে আসতে আসতে খবরটি ইতিমধ্যেই একটি শিশু পান্ডা সম্পর্কিত প্রতিবেদনে চলে যায়।

আমি দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে পরবর্তী সংবাদ অনুষ্ঠান দেখেছিলাম। চতুর্থ সংবাদটিতে ‘এফ*’-কে দেখা গেল। পুলিশে ঘেরা স্থান থেকে তাকে বের হয়ে আসতে দেখা যাচ্ছিল, সিঁড়ি বেয়ে নামছিল সে এবং একটি কালো ভ্যানে উঠেছিল। সেই ধীরগতির যাত্রা পুরোটাই ধরা পড়ে ক্যামেরায়। সে যে ‘এফ*’ এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ছিল না। তার চেহারা চিনতে কোনো ভুল হয় নি। দেখে মনে হচ্ছিল সে হাতকড়া পরা ছিল, কারণ তার হাত দুটি সামনের দিকে ছিল এবং তা একটি গাঢ় রঙের কোট দ্বারা আবৃত ছিল। নারী অফিসাররা তার দুপাশে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সে তার মাথা উঁচু করে তুলে রেখেছিল। তার মুখ বন্ধ ছিল এবং তার দৃষ্টি ছিল শান্ত যেহেতু সে সোজা সামনে তাকিয়ে ছিল। তার চোখগুলো অবশ্য মাছের চোখের মতো সম্পূর্ণভাবে ভাবলেশহীন ছিল। আলগা চুলের কয়েকটি স্ট্র্যান্ড ছাড়া, তাকে স্বাভাবিকের মতোই দেখাচ্ছিল। তবুও, টিভিতে তার মুখে এমন কিছুর অভাব ছিল যা এতে সবসময়ই জীবন্ত একটি আভা দিত। অথবা সম্ভবত সে ইচ্ছাকৃতভাবেই এটি একটি মুখোশের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল।

সংবাদ-পাঠিকা ‘এফ*’-এর আসল নাম এবং কীভাবে পুলিশ তাকে বড় মাপের একটি জালিয়াতির সহযোগী হিসেবে গ্রেফতার করেছিল তা বিস্তারিত বর্ণনা করছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান অপরাধী তার স্বামী, যাকে কয়েকদিন আগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। যখন তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হচ্ছিল তখনকার একটি ভিডিও দেখানো হয়। সেই প্রথম আমি তার স্বামীকে দেখেছিলাম এবং সত্যি বলতে আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম যে তিনি কতটা সুদর্শন ছিলেন। তিনি একজন জমকালো মানুষ ছিলেন, পেশাদার মডেলের মতো প্রায় অবাস্তব রকমের আকর্ষণীয়। তিনি ‘এফ*’-এর থেকে ছয় বছরের ছোট বলে জানা গেছে।

সে তার থেকে ছয় বছরের ছোট একজন সুদর্শন পুরুষকে বিয়ে করেছে এটা জেনে আমার হতবাক হওয়ার কোনো কারণ অবশ্য ছিল না। এমন ধরনের অসম দম্পতি আছে। আমি নিজেও কয়েকজনকে চিনি। তারপরও, যখন আমি তাদের দৈনন্দিন জীবনের বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করি—‘এফ*’ এবং এই চমকপ্রদ আকর্ষণীয় মানুষটি, ডাইকানিয়ামাতে সেই পরিপাটি ফ্ল্যাটে এক ছাদের নিচে বাস করত—আমি হতভম্ব না হয়ে পারি নি। আমি কল্পনা করি যে বেশিরভাগ লোক তাদের খবরে দেখে তাদের জুটি সম্পর্কে অবাক হতে পারে, তবে আমি তখন যে অস্বস্তির অনুভূতি অনুভব করেছি তা অনেক বেশি স্বতন্ত্র ছিল, আমার ত্বকে সত্যিকারের টনটনে ব্যথার মতো। সেখানে বিধ্বংসী কিছু ছিল, অসহায় পুরুষত্বহীনতার মতো অনুভূতি পেতে আপনি যখন কোনো উদ্ভট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তেমন।

তারা যে অপরাধে অভিযুক্ত তা ছিল সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জালিয়াতি। তারা একটি বোগাস বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল, উচ্চ হারে ফেরত প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তহবিল নিয়েছিল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনা তারা করে নি, যে কোনো উপায়ে ঘাটতি পূরণের জন্য তহবিলগুলোকে এদিক-ওদিক সরিয়ে নিয়েছিল। এটি স্পষ্টতই একটি বিধ্বংসী স্কিম ছিল। শুম্যানের পিয়ানো সঙ্গীতের এত গভীর উপলব্ধিসম্পন্ন এমন একজন বুদ্ধিমান নারী কেন এমন একটি নির্বোধ অপরাধে সহায়তা করবে, যেখানে সে সর্বদা আটকা পড়ে থাকবে? পুরো ব্যাপারটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। হয়তো সেই লোকটির সাথে তার সম্পর্কের কিছু নেতিবাচক চাপ তাকে অপরাধমূলক ঘেরাটোপে টেনে এনেছিল। হয়তো তার নিজের অশুভ আত্মা নিঃশব্দে এর কেন্দ্রে লুকিয়ে ছিল। এটাই একমাত্র দিক যা আমি অনুধাবন করতে পারি।

সবাই বলছিল, তারা ১০ মিলিয়নের বেশি ক্ষতির জন্য দায়ী। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই বয়স্ক পেনশনভোগী। টিভিতে তাদের কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল এবং আমি জেনেছি যে তাদের অবসরকালীন সঞ্চয়ের প্রতিটি মূল্যবান পয়সা, যা তাদের বাকি জীবন বেঁচে থাকার জন্য সঞ্চিত ছিল, তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। আমি তাদের জন্য দুঃখিত, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। পুরো ব্যাপারটা ছিল একটি মাঝারি অপরাধ। কিছু কারণে, অনেক মানুষ এই ধরনের বহুলব্যবহৃত মিথ্যা দ্বারা আকৃষ্ট বলে মনে হয়। সম্ভবত এটি প্রাচুর্যতা যা তাদের আকর্ষণ করে, কে জানে? সোজা-সরল মানুষদের সাথে পৃথিবীটা প্রতারকে ছেয়ে গেছে। এটা টিভিতে যেভাবেই উপস্থাপন করা হোক না কেন, দোষ যারই থাকুক না কেন, এটা ছিল জোয়ার-ভাটার মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সত্য।

‘তাহলে তুমি কী করতে চাইছো?’ খবর শেষ হওয়ার পর আমার স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল।

‘কী বলতে চাইছো? আমি কী করতে পারি?’ রিমোট টিপে টিভি বন্ধ করে আমি বলেছিলাম।

‘কিন্তু সে তো তোমার বন্ধু, তা নয় কি?’

‘আমরা শুধু মাঝে মাঝে একবার একত্র হই এবং সঙ্গীত নিয়ে আলাপ করি। এর বাইরে আমি কিছুই জানি না।’

‘সে তোমাকে কখনো তাদের সাথে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দেয় নি?’

আমি চুপচাপ মাথা নেড়েছিলাম। ঠিক জানি না কেন, সে কখনোই আমাকে এই ধরনের কিছুর সাথে জড়িত করার চেষ্টা করে নি। এতটুকুই কেবল আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।

‘আমি তাকে ভালোভাবে চিনতাম না, কিন্তু কখনোই ভাবিনি যে সে এমন একজন যে এমন ভয়ানক কিছু করতে পারে।’ আমার স্ত্রী বলেছিল। ‘আমার ধারণা তুমিও কখনোই বলতে পারবে না।’

না, হঠাৎ করেই ভাবলাম, এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। ‘এফ*’-এর এক ধরনের বিশেষ আবেশ ছিল যা মানুষকে আকৃষ্ট করত। এবং এর মধ্যে—তার সেই অদ্ভুত, লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে—এক ধরনের শক্তি বিদ্যমান ছিল যা অন্যের মন ও হৃদয়কে আচ্ছন্ন করত। এটাই তার প্রতি আমার কৌতূহল জাগিয়েছিল। এবং যখন সেই বিশেষ আকর্ষণীয় শক্তিটি তার যুবক স্বামীর দর্শনীয় চেহারার সাথে একত্রিত হয়েছিল, তখন যে কোনো কিছুই সম্ভব ছিল এবং সম্ভবত, তা অপ্রতিরোধ্য। এর থেকে একটি দুষ্টশক্তির উদ্ভব হয়েছিল, যা যে কোনো সাধারণ জ্ঞান বা যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যদিও আমার কখনোই জানার কোনো উপায় ছিল না যে এই অসঙ্গত জুটিকে ঠিক কী একত্র করেছিল।

বেশ কয়েকদিন ধরে টিভি নিউজে ঘটনাটি প্রদর্শন করে, অবিরামভাবে একই ক্লিপ বারবার দেখায়। তার মৃত-মাছের মতো চোখ সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে, তার সুদর্শন কম বয়সী স্বামী ক্যামেরার মুখোমুখি। তার পাতলা ঠোঁটের কোণগুলো সম্ভবত সহজাতভাবে সামান্য উঁচু ছিল। পেশাদার চলচ্চিত্র তারকাদের যখন তাদের প্রয়োজন হয় তখন যে ধরনের হাসি দেয়। দেখে মনে হচ্ছিল তিনি সারা বিশ্বের কাছে তার হাসি পৌঁছে দিতে চান। তার মুখের মধ্যে এমন কিছু ছিল যা একটি সুগঠিত মুখোশের মতো মনে হচ্ছিল। যাই হোক না কেন, এক সপ্তাহ পরে গ্রেফতারের ঘটনা সবই ভুলে গিয়েছিল। অন্তত, টিভি স্টেশনগুলো আর আগ্রহী ছিল না। আমি সংবাদপত্র এবং সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে নতুন কাহিনী অনুসন্ধান করতে থাকি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলোও বন্ধ হয়ে যায়, জলের স্রোত এসে বালিতে শোষিত হয়ে যাওয়ার মতো। অবশেষে, তারা সম্পূর্ণরূপে সমাপ্তি টানে।

এবং তারপর থেকে ‘এফ*’ আমার পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেল। সে কোথায় ছিল আমার কোনো ধারণা ছিল না। সে তখনও আটক, বা কারাগারে, নাকি জামিনে বাড়িতে ফিরে এসেছিল তা জানার কোনো উপায় ছিল না। তার বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো নিবন্ধও ছিল না, যদিও অবশ্যই জালিয়াতিটি একরকম সাজা দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট বড় ছিল। অন্তত আমি যে সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনের নিবন্ধগুলো পড়েছিলাম সে অনুযায়ী, এটা স্পষ্ট ছিল যে সে সক্রিয়ভাবে তার স্বামীকে আইন ভঙ্গ করতে সহায়তা করেছিল।

তারপর থেকে দীর্ঘ সময় কেটে গেছে এবং এখনও, যখনই শুম্যানের কার্নাভালের পারফরম্যান্স সমন্বিত কোনো কনসার্ট হয়, আমি উপস্থিত থাকার চেষ্টা করি। এবং ইন্টারমিশনের সময় এক গ্লাস ওয়াইন হাতে পুরো হল ও লবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করি, তাকে খুঁজতে থাকি। তাকে আর কখনোই খুঁজে পাই নি, কিন্তু আমি সবসময় অনুভব করি যে, যেকোনো মুহূর্তে সে ভিড়ের ভেতর থেকে সামনে এসে হাজির হবে।

আমি কার্নাভালের যেকোনো নতুন সিডি এখনও কিনে রাখি। এবং আমি এখনও আমার নোটবুকে তাদের বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে রাখি। অনেক নতুন রেকর্ডিং এসেছে, তবুও আমার পছন্দের তালিকায় এক নম্বরে এখনও রুবিনস্টাইনেরটিই আছে। রুবিনস্টাইনের পিয়ানো মানুষের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে না। পরিবর্তে, তার পরিবেশনা মৃদুভাবে, ধীরে ধীরে, মুখোশ এবং বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বয়ে যায়।

সুখ সবসময় একটি আপেক্ষিক বিষয়। তুমি কি তা মনে করো না?

এটা এমন কিছু যা এর অনেক আগে ঘটেছিল।

যখন কলেজে পড়তাম, আমি একবার একটি মেয়ের সাথে ডেট করেছি, যে মেয়েটি মোটামুটি অনাকর্ষণীয় ছিল। আসলে, ‘মোটামুটি’ শব্দটি চিহ্নিত করে রাখুন। আমার এক বন্ধুর আয়োজন করা একটি ডাবল ডেট ছিল সেটা, এবং তাকে আমার সঙ্গী হিসেবে দেখা গিয়েছিল। সে এবং আমার বন্ধুর বান্ধবী একই কলেজের ছাত্রীনিবাসে থাকত এবং তারা স্কুলে আমার এক বছর পেছনে ছিল। আমরা চারজন একসাথে দ্রুত কিছু খাবার খেয়ে নিয়েছিলাম, তারপর আমরা জুটি বেঁধে নিজেদের মতো করে চলে গিয়েছিলাম। শরতের শেষে ছিল দিনটা।

সে এবং আমি একটি পার্কের চারপাশে ঘুরেছি, তারপর একটি ক্যাফেতে গিয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে কিছু কথা বলেছিলাম। সে খাটো ছিল, তার চোখ ছিল ছোট এবং তাকে একজন বিদগ্ধ ব্যক্তির মতো লাগছিল। সে শান্তভাবে লাজুক ও স্পষ্ট কণ্ঠে কথা বলছিল। তার নিশ্চয়ই চমৎকার ভোকাল কর্ড ছিল। আমি কলেজের টেনিস ক্লাবের সাথে যুক্ত আছি, সে আমাকে বলেছিল। তার বাবা-মা টেনিস পছন্দ করতেন, সে আরও বলেছিল এবং সে ছোট থেকেই তাদের সাথে খেলত। একটি সুস্থ পরিবার, এমনই শোনাচ্ছে ব্যাপারটা এবং এমন একটি পরিবার যা সম্ভবত একই সাথে খুব ভালো ছিল। কিন্তু আমি খুব কমই টেনিস খেলতাম, তাই এই বিষয়ে আলাপে একটা বাধা সৃষ্টি করে। আমি জ্যাজ পছন্দ করতাম, কিন্তু সে এ সম্পর্কে কিছুই জানত না। তাই কথা বলার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। তবুও, সে বলেছিল যে সে জ্যাজ সম্পর্কে আরও কিছু শুনতে চায়, আমি তাই মাইলস ডেভিস এবং আর্ট পিপারের একটি মনোলোগ দিয়ে আলাপ শুরু করি এবং কীভাবে আমি জ্যাজে আগ্রহী হয়েছি, কী আমাকে এতে আকৃষ্ট করেছিল সে সব বলি। সে মনোযোগ সহকারে শুনেছিল, কিন্তু আমি নিশ্চিত নই যে সে কতটা বুঝেছিল। তারপর আমি তাকে ট্রেন স্টেশনে এগিয়ে দিলাম এবং আমরা বিদায় জানালাম।

বিদায়ের সময় সে আমাকে তার ছাত্রীনিবাসের ফোন নম্বর দিয়েছিল। সে তার নোটবুকের একটি ফাঁকা পৃষ্ঠায় নম্বরটি লিখেছিল এবং সুন্দরভাবে ছিঁড়ে আমার হাতে দিয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে কখনো ফোন করি নি।

কয়েকদিন পরে আমি আমার বন্ধুর কাছে যাই যে আমাকে ডাবল ডেটে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং সে ক্ষমা চেয়েছিল।

‘সেদিন—কীভাবে যে বলি—সেই অনাকর্ষণীয় মেয়েটির সাথে তোমাকে জড়িয়ে ফেলার জন্য আমি দুঃখিত,’ সে বলেছিল। ‘আমি তোমাকে সত্যিই কিউট একটা মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে কিছু ঝামেলা এসে যায় এবং তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল, তাই আমরা অন্য কোনো মেয়েকে পাঠাতে বলেছিলাম। সেই সময় ছাত্রীনিবাসে আর কেউ ছিল না। আমার বান্ধবী তোমাকে বলতে চেয়েছিল যে, সে-ও দুঃখিত। আমি তোমাকে এটা পুষিয়ে দিবো। কথা দিচ্ছি।’

আমার বন্ধু এই কথা বলার পর আমার মনে হয়েছিল মেয়েটিকে ফোন করা উচিত। অবশ্যই তার ভেতরে কোনো সৌন্দর্য ছিল না, তবে সে কেবল ‘আকর্ষণহীন মেয়ে’-এর চেয়ে বেশি কিছু ছিল। উভয়ের মধ্যে সামান্য পার্থক্য ছিল এবং আমি তাকে এভাবে ছেড়ে যেতে চাই নি। আমি জানি না কীভাবে এটা করা যায়, কিন্তু এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমি তাকে যেতে দিতে পারি না। সম্ভবত আমি তাকে আমার বান্ধবী হিসেবে চাই না। কিন্তু আমি তার সাথে পুনরায় দেখা করা এবং কথা বলায় আপত্তি করব না। আমি জানতাম না যে, আমরা আসলে কী বিষয়ে কথা বলব, তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আলাপের জন্য আমরা কিছু খুঁজে নিতে পারব। আমি তাকে ‘কুৎসিত মেয়ে’ তকমা দিয়ে তার থেকে দূরে সরে যেতে পারি না।

কিন্তু আমি তার নম্বর লেখা কাগজটা খুঁজে পাই নি। কাগজটা কোটের পকেটে রাখা ছিল এটা আমার মনে আছে, কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। আমি হয়তো ভুলবশত বাজারের কিছু অপ্রয়োজনীয় রসিদের সাথে কাগজটা ফেলে দিয়েছি। সম্ভবত এটাই ঘটেছে। ফলাফল হলো, আমি তাকে ফোন করতে পারি নি। আমি যদি আমার বন্ধুকে বলতাম, সে আমাকে ছাত্রীনিবাসের ফোন নম্বর জোগাড় করে দিতে পারত, কিন্তু আমি যখন তাকে এটা বলব তখন তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না, এবং আমি তার কাছে আর বলতে পারি নি।

আমি এই পুরো ঘটনাটা বহুদিন ভুলে ছিলাম, এবং আর কখনো মনে মনে তা পুনরায় ভাবার চেষ্টা করি নি। কিন্তু এখানে, যখন আমি ‘এফ*’ সম্পর্কে লিখছি এবং সে দেখতে যেমন ছিল, পুরো ঘটনাটা হঠাৎ আমার সামনে ভেসে উঠল। বিস্তারিতভাবে।

যখন আমার বিশ বছর বয়স তখন শরতের শেষের দিকে আমি তেমন-আকর্ষণীয়-নয় ধরনের এক মেয়ের সাথে শুধুমাত্র একবারের জন্য ডেট করেছিলাম এবং আমরা একটি পার্কের চারপাশে হেঁটে হেঁটে একটা দিন পার করেছিলাম। এক কাপ কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমি আর্ট পিপারের অল্টো স্যাক্সের সূক্ষ্ম পয়েন্টগুলো ব্যাখ্যা করেছিলাম, কীভাবে তিনি এটা দিয়ে মাঝে মাঝেই আশ্চর্যজনক ধ্বনির সুর তৈরি করতেন। যা কেবল বাদ্যযন্ত্রের কিছু গুঞ্জন ছিল না, তার মনের অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তিও জড়িয়ে ছিল (হ্যাঁ, আমি আসলে অভিব্যক্তি শব্দটিই ব্যবহার করেছিলাম, বিশ্বাস করুন বা না করুন)। এবং তারপর আমি চিরতরে তার ফোন নম্বর হারিয়ে ফেলি। চিরকাল, বলা বাহুল্য, এটি একটি দীর্ঘ সময়।

এ দুটোই আমার তুচ্ছ জীবনে ঘটে যাওয়া একজোড়া ছোটখাটো ঘটনা ছাড়া আর কিছুই না। পথের ধারে পাওয়া এক-আধটু হোঁচটের মতো। ঘটনাগুলো না ঘটলেও, আমার সন্দেহ আছে যে আমার জীবন এখন যেমন আছে তার থেকে অনেকটাই ভিন্ন হতে পারত কিনা। কিন্তু তবুও, এই স্মৃতিগুলো অনেক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মাঝে মাঝেই আমার কাছে ফিরে আসে। এবং যখন তারা আসে, তাদের আকস্মিক শক্তি আমার ভেতরটাকে নাড়িয়ে দেয়। শরতের বাতাস যেমন রাতে দমকা হাওয়া হয়ে বয়ে, অরণ্যে ঝরে পড়ে থাকা পাতাগুলোকে নাড়িয়ে, মাঠের পাম্পাস ঘাসগুলোকে দুলিয়ে, মানুষের বাড়ির দরজায় জোরে জোরে বারবার ধাক্কা দেয়, তেমন।

হারুকি মুরাকামি : বর্তমান সময়ে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হারুকি মুরাকামির জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে জাপানের কিয়োটোতে। তার লেখা পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার সাবলীল ও সরল ভাষায় লেখা গদ্য অনায়াসেই টেনে নেয় যেকোনো স্তরের সাহিত্য পাঠককে। ভাষার এ সরলতা এতটাই জাদুকরি যে দুর্বোধ্য বিষয়কেও সরল অনুভূতিতে রূপান্তরিত করতে পারে। আর হারুকি মুরাকামি লেখার যে বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন বা বিষয়বস্তুকে যেভাবে উপস্থাপন করেন তা অনেকটা অদ্ভুত কিংবা বলা যায় সাধারণভাবে যা কেউ ভাবে না, দেখা পরিবেশটা যেভাবে কখনো কেউ দেখে না—ঠিক সেভাবেই তিনি ভাবেন এবং দেখেন। এ কারণে তাঁর লেখা পড়ার পর আমরা টের পাই চেনা পরিবেশের ভেতরেই অচেনা জগৎ উঠে আসছে সামনে। তিনি ফ্রানৎস কাফকা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

অনূদিত গল্পটি হারুকি মুরাকামির সাম্প্রতিক গল্পগ্রন্থ ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার’-এ ‘কার্নাভাল’ শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত। ২০২০ সালে গল্পগ্রন্থটির জাপানি সংস্করণ এবং ২০২১ সালে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। জাপানি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল। গল্পগ্রন্থটির ইংরেজি সংস্করণ থেকে নিয়ে এই অনুবাদটি করা হয়েছে। গল্পটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা।

 

Read Previous

অগ্নিবাসর

Read Next

নুশান : দ্য স্পেশাল চাইল্ড – প্রথম পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *